ইউনেস্কো-আইএলও’র ১৯৬৬ সালের সনদ বাস্তবায়নের দাবি

‘ম্যানেজিং কমিটি’ বাতিল করে ‘শিক্ষা সার্ভিস কমিশন’ চান শিক্ষক নেতারা

গেজেট প্রতিবেদন

শিক্ষার মান উন্নয়ন ও সরকারি-বেসরকারি বৈষম্য কমাতে পুরো শিক্ষাব্যবস্থা ধাপে ধাপে জাতীয়করণের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ কলেজ শিক্ষক সমিতি (বাকশিস) ও বাংলাদেশ অধ্যক্ষ পরিষদ (বিপিসি)। একই সঙ্গে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গভর্নিং বডি বা ম্যানেজিং কমিটি প্রথা বাতিল করে শিক্ষক নিয়োগের জন্য স্বতন্ত্র ‘শিক্ষা সার্ভিস কমিশন’ গঠনের দাবি জানিয়েছেন শিক্ষক নেতারা।

বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে রবিবার রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের মাওলানা মোহাম্মদ আকরাম খাঁ হলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি জানানো হয়। লিখিত বক্তব্যে শিক্ষক নেতারা বলেন, দেশের শিক্ষাব্যবস্থার ৯৫ শতাংশ পরিচালনা করেন বেসরকারি শিক্ষকরা। অথচ সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষকদের মধ্যে বড় ধরনের বৈষম্য রয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষক নেতৃবৃন্দ বলেন, আমাদের শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নের প্রশ্নে একথা খুবই সংগতভাবে বলা যায় যে, শিক্ষার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে ভৌত অবকাঠামোর উন্নয়ন ও শিক্ষা উপকরণাদি প্রদান করা হয় সত্য, কিন্তু শিক্ষকের মানোন্নয়ন ছাড়া শিক্ষার মানোন্নয়ন সম্ভব নয়। সেজন্য প্রয়োজন প্রগতিশীল, মেধাবী ও সৃজনশীল ব্যক্তিদের শিক্ষকতায় আকৃষ্ট করা। শিক্ষককে জ্ঞানসমৃদ্ধ, কুশলী ও দক্ষ করে গড়ে তোলার জন্য শিক্ষকতা জীবনের প্রথম থেকেই প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও গবেষণা কর্মের প্রয়োজনীয় সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। শিক্ষকের নায্য অধিকার ও মর্যাদার কথা বলতে গেলে বলতে হয়, আমাদের দেশে এ বিষয়টি চরমভাবে উপেক্ষিত।

তাদের ভাষ্য, বেসরকারি শিক্ষকেরা বর্তমানে শতভাগ মূল বেতন পেলেও বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা ও উৎসব ভাতায় বৈষম্যের শিকার। সরকারি শিক্ষকদের মতো তাঁদের জন্য পূর্ণাঙ্গ অবসরকালীন আর্থিক সুবিধা বা পেনশন চালুর দাবিও জানান তারা।

শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে স্থানীয়ভাবে নিয়োগ পুরোপুরি বন্ধ করে স্বতন্ত্র ‘শিক্ষা সার্ভিস কমিশন’ গঠনের ওপর জোর দেন শিক্ষক নেতারা। তাদের মতে, শিক্ষাঙ্গনে দলাদলি ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা বন্ধ করতে বর্তমান গভর্নিং বডি বা ম্যানেজিং কমিটি প্রথাও বিলুপ্ত করা প্রয়োজন। এর পরিবর্তে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার মতো নিয়মনীতি চালুর আহ্বান জানান তাঁরা।

রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে যত্রতত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের অনুমোদন না দিয়ে জরিপের মাধ্যমে চাহিদার ভিত্তিতে বা ‘নিড বেসড’ পদ্ধতিতে প্রতিষ্ঠান খোলার অনুমতি দেওয়ার দাবিও জানানো হয়।

এ ছাড়া বেসরকারি কলেজে সরকারি কলেজের মতো জনবল কাঠামো চালু, অনার্স-মাস্টার্স কোর্সে পাঠদানরত শিক্ষকদের যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে এমপিওভুক্ত করা এবং শিক্ষা অধিদপ্তর ও শিক্ষা বোর্ডসহ শিক্ষা প্রশাসনে বেসরকারি শিক্ষকদের আনুপাতিক হারে প্রেষণে বা সরাসরি নিয়োগের দাবি জানানো হয়। শিক্ষকদের মর্যাদা ও অধিকার রক্ষায় ইউনেস্কো-আইএলওর ১৯৬৬ সালের সনদ বাস্তবায়নেরও দাবি জানান তাঁরা।

সংবাদ সম্মেলনে বাকশিস সভাপতি অধ্যক্ষ মোঃ ইসহাক হোসেন, বিপিসি সভাপতি অধ্যক্ষ মোহাম্মদ মাজহারুল হান্নান এবং বাকশিসের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ইলিম মোহাম্মদ নাজমুল হোসেনের স্বাক্ষর করা লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করা হয়। এ সময় অধ্যক্ষ মুজিবুর রহমান হাওলাদার, অধ্যক্ষ সাহিদুন নাহার, অধ্যক্ষ রেজাউল হক, অধ্যাপক সৈয়দ মুহাম্মদ ইউসুফ সুমনসহ অন্যান্য শিক্ষক নেতা উপস্থিত ছিলেন।

নেতৃবৃন্দ বলেন, আমাদের গোটা শিক্ষা ব্যবস্থার প্রায় ৯৫ ভাগই পরিচালনা করে বেসরকারি শিক্ষক, আর একটি স্বাধীন দেশের জন্য এ বেসরকারি শিক্ষকতার অবস্থা অত্যন্ত লজ্জাজনক। ১৯৭১-এর স্বাধীনতা অর্জনের পরেও চলমান ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি দু’টি ধারায় বৈষম্যমূলক শিক্ষাব্যবস্থা চলতে থাকে এবং তা সম্প্রসারিত হতে থাকে। যদিও একটি স্বাধীন দেশে কোনক্রমেই এ ধরনের বৈষম্য থাকা উচিত নয়। তাই স্বাধীনতা লাভের পর শিক্ষক সমাজের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এবং আপনাদের যৌক্তিক সংবাদ পরিবেশন ও প্রতিবেদনের ফলে সরকারি-বেসরকারি বৈষম্যের অবসানকল্পে শিক্ষাব্যবস্থার সকল স্তরকে জাতীয়করণের মাধ্যমে এক ও অভিন্ন ধারায় রূপান্তরিত করতে সরকার নীতিগতভাবে অঙ্গীকার করলেও আজো তা বাস্তবায়িত হয়নি।




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন